সময়টা সত্তরের দশকের মাঝামাঝি। তত দিনে সাহিত্যে এক নতুন স্বরের সংযোজন করেছেন লেখকটি। সেই লেখকই একটি চিঠি পেলেন। চিঠি খুলে দেখলেন, ‘তোমার এই উপন্যাসে কোনও বে-দাগ চরিত্র পেলাম না।’

চিঠি-প্রাপক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। চিঠিটি এসেছে সাহিত্যিক বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় তথা বনফুলের কাছ থেকে।

চিঠি দেওয়ার সময়ে বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে শীর্ষেন্দুবাবুর কোনও প্রত্যক্ষ পরিচয় ছিল না। কিন্তু শীর্ষেন্দুবাবুর ‘পারাপার’ উপন্যাসটি পড়ে চিঠি দিতে কসুর করেননি বনফুল।

সব সময়েই কি এমন অযাচিত ভাবে আলাপ করেন বনফুল? তা বোধহয় একেবারেই নয়। অন্তত একটি ঘটনা এর প্রমাণ দেয়।

 সময়টা খানিক পিছিয়ে নেওয়া যেতে পারে।

১৯৩৫ সাল। রাজস্থানের জয়পুরের বাসিন্দা রামচন্দ্র শর্মা নামে এক ব্রাহ্মণ মন্দিরে বলি বন্ধ করতে চেয়ে কালীঘাট মন্দিরের কাছে অনশন শুরু করলেন। বেশির ভাগ বাঙালিই রামচন্দ্রের এই কর্মসূচির বিরুদ্ধে। কিন্তু সমর্থন জানালেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের এই অবস্থানের বিরোধিতায় খানিকটা ব্যঙ্গের সুরেই ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-র দোল সংখ্যায় একটি কবিতা লিখলেন বনফুল। কবিতা পড়ে রাগ নয়, বরং কবির সঙ্গে আলাপ করতে চাইলেন রবীন্দ্রনাথ।

কিন্তু বনফুল জানালেন, তিনি ব্রাহ্মণ ও ডাক্তার। তাই ‘কল’, অর্থাৎ নিমন্ত্রণ ছাড়া কোথাও যান না। শেষমেশ সপরিবার বনফুলকে নিমন্ত্রণই জানালেন রবীন্দ্রনাথ।

নিমন্ত্রণ পেয়ে পরিবার নিয়ে বনফুল গেলেন শান্তিনিকেতন। আলাপ, খাওয়াদাওয়া সবই চলছে। আচমকা বনফুলের শিশুপুত্র চিরন্তন আধো-আধো গলায় ‘দল’ চেয়ে বসল। জল দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট পরিচারকটি কাছাকাছি নেই তখন। তা দেখে রবীন্দ্রনাথের ‘মুখে কে যেন আবীর মাখিয়ে দিলে’। কেন এমনটা? বনফুলের মনে হল, ওই শিশুকে জল ‘চাইতে হল’, এটাই অভিজাত রবীন্দ্রনাথের কাছে গ্লানির!

এই শুরু রবীন্দ্র-সান্নিধ্যের। পরে সে আলাপ গড়াল ঘনিষ্ঠতায়। সেই ঘনিষ্ঠ-সান্নিধ্য পর্বে রবীন্দ্রনাথকেও এক বার বেশ বিড়ম্বনায় ফেললেন বনফুল।

ঘটনাটা এ রকম। বনফুলের ‘মানুষের মন’ গল্পটি পড়ে ভারী খুশি হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। চাইলেন, অনুজ লেখককে কিছু একটা উপহার দিতে। বনফুলের আবদার, উপহার হিসেবে গুরুদেবের গায়ে দেওয়া একটি পুরনো জামা। রবীন্দ্রনাথ কিছুতেই দেবেন না। বনফুলও নাছোড়। শেষমেশ এক দিকে দামি পশম, অন্য দিকে রেশম দেওয়া একটি প্রকাণ্ড জোব্বা উপহার মিলল।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মতান্তরও ঘটেছে। বনফুলের ‘তৃণখণ্ড’-য় কিছু কবিতা রয়েছে। সেগুলি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মতামত, ‘ডাক্তারের ক্লিনিকে ওরা ভান করা সৌখিন রোগী’। বনফুলের ‘শ্রীমধুসূদন’ নাটকের কিছু অংশও রবীন্দ্রনাথের পছন্দ হয়নি। বদলানোর পরামর্শ দিলেও, বনফুল তা করেননি।

(২)

আসলে লেখক বা ব্যক্তি-জীবন, যাই-ই হোক না কেন, বনফুল এমনই স্বাধীনচেতা। তাঁর একরোখা চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায় একেবারে ছোটবেলা থেকেই।

বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের ‘বনফুল’ হয়ে ওঠার ঘটনাটাও এই একরোখা চরিত্রেরই উদাহরণ।

বনফুল তখন বিহারের সাহেবগঞ্জ রেলওয়ে হাইস্কুলের ছাত্র। সেই সময়ে ‘বিকাশ’ নামে হাতে লেখা পত্রিকায় কবিতা লেখালিখি চলত। পরে ‘মালঞ্চ’ পত্রিকায় অষ্টম শ্রেণির ছাত্র বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা ছাপা হল। সকলেই খুশি। শুধু এক জন বাদে। স্কুলের হেডপণ্ডিত রামচন্দ্র ঝা।

পরিমল গোস্বামী ও বনফুল।

পণ্ডিতমশাইয়ের ধারণা, সংস্কৃতে বলাই একশো পাওয়ার যোগ্য। পাচ্ছেন না ওই কবিতার কারণে। তাই নির্দেশ, ‘কবিতা লেখা চলবে না’। মহা ফাঁপরে পড়ল কিশোর বনফুল। উপায় বাতলালেন অগ্রজস্থানীয় সুধাংশুশেখর মজুমদার। সেই ছদ্মনাম নেওয়া ‘বনফুল’। কিন্তু ছদ্মনামে লিখেও শেষ রক্ষা হল না। ধরা পড়েই গেলেন পণ্ডিতমশাইয়ের কাছে।

‘নির্দেশ অমান্য কেন?’ জানতে চাইলেন পণ্ডিতমশাই। বলাইয়ের জবাব, ‘না লিখে পারি না যে’! এ বার আর পণ্ডিতমশাই বাধা দিলেন না। তবে কয়েকটা ‘টাস্ক’ দিলেন, কিছু সংস্কৃত শ্লোক অনুবাদ করার। ‘প্রবাসী’ ও ‘ভারতী’-তে তা ছাপাও হল। কবিতা লিখেও অবশ্য ১৯১৮-য় বনফুল ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন প্রথম বিভাগেই, স্কুলের মধ্যে প্রথম হয়ে।

কিন্তু এত কিছু নাম থাকতে বনফুল ছদ্মনাম কেন, সে প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক। এ কথার জবাব নিজেই দিয়েছেন বনফুল, ‘বন চিরকালই আমার নিকট রহস্য নিকেতন। এই জন্যই বোধহয় ছদ্মনাম নির্বাচন করিবার সময় ‘‘বনফুল’’ নামটা আমি ঠিক করিলাম।’

আসলে এই ‘রহস্য নিকেতনে’র সঙ্গে বনফুলের পরিচয় সেই ছোটবেলা থেকেই।

বনফুলের জন্ম ১৯ জুলাই, ১৮৯৯। বাবা সত্যচরণ মুখোপাধ্যায়। মা মৃণালিনীদেবী। বনফুলের জন্মের সময়ে ঘোর বৃষ্টি। গঙ্গা আর কোশীতে জল বেড়েছে। চিকিৎসক সত্যচরণের কর্মস্থল, নিবাস বিহারের মণিহারীর বাড়িটির অবস্থান তখন দ্বীপের মতো।

বনফুলের জন্ম-সংবাদ পেয়ে সত্যচরণের বন্ধু প্রমথনাথ মুখোপাধ্যায় বাড়িতে এসেছেন। দেখলেন, মৃণালিনীদেবীর একটু জ্বর এসেছে। মুহূর্তে নিদান, চা খেতে হবে। তখন বাড়িতে চায়ের চল ছিল না। শেষমেশ ঘাটের এক রেস্তরাঁ থেকে চা পাতা এনে ঘটিতে ভিজিয়ে গ্লাসে করে চা পরিবেশন হল।

জন্মের পরে অজান্তেই প্রকৃতির এমন বিপর্যয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল বনফুলের।

এ বার বড় হওয়া। বনফুল বড় হলেন বাড়িরই এক মুসলমান মজুর চামরুর বউয়ের দুধ খেয়ে। ‘জংলিবাবু’ বনফুল হাঁটতে শিখেই হাতে তুলে নিল একটা ছোট্ট লাঠি। আর দুধ-মায়ের সঙ্গে টলমল পায়ে দেখা শুরু হল মাঠঘাট, বন।

পূর্বপুরুষ সূত্রেও ‘বন’-এর সঙ্গে যোগ রয়েছে বনফুলের। তাঁর পূর্বপুরুষের আদি বাড়ি হুগলির শিয়াখালা গ্রাম। বাস্তুভিটের কাছে কাঁটাবন থাকায় এই পরিবার ‘কাঁটাবুনে মুখুজ্জ্যে’ নামে পরিচিত ছিল।

জন্ম ও পরিবেশ সূত্রে বনের সঙ্গে এমন নিবিড় যোগাযোগ প্রকৃতির নিজস্ব রূপ-রং-গন্ধের সঙ্গেও পরিচিতি ঘটায় বনফুলের। আর তাই পরে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের ছাত্রসমাজের মধ্যে বড় হওয়া আয়কর বিভাগের আধিকারিক প্রদ্যোৎকুমার সেনগুপ্তের সাহচর্যে পাখি দেখার চোখটাও তৈরি হতে সময় লাগে না। এই ‘দেখা’রই ফলশ্রুতি ‘ডানা’ উপন্যাসটি।

এমন দেখার চোখ আর সাহচর্য সাহিত্যিক বনফুলকে প্রভাবিত করেছে বার বার।

এ প্রসঙ্গে প্রথমেই বলতে হয় তাঁর বাবার কথা। মায়ের মৃত্যুর পরে ছেলে বনফুলের অনুরোধে সত্যচরণ জীবনচরিত লিখে রেখে গিয়েছিলেন। সেটিকে অবলম্বন করেই বনফুল লিখলেন ‘উদয় অস্ত’ উপন্যাসটি।

আবার শীর্ষেন্দুবাবুর উপন্যাসে ‘বে-দাগ’ (কলঙ্কহীন) চরিত্র নেই বলেছিলেন যে মানুষটি, তিনি নিজের লেখায় কিন্তু ‘বে-দাগ’ ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন।

সম্ভবত বনফুল তখন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। এক পুলিশ অফিসারের সঙ্গে তাঁর বেশ ভাব জমেছে। কথা প্রসঙ্গে বনফুল তাঁকে এক দিন বললেন, ‘ইংরেজের যতই দোষ থাকুক তাহারা দুষ্টের শাসন করে।’ সেই অফিসার বললেন, ‘হ্যাঁ গরিব দুষ্টদের’। নিজের কথার প্রমাণ হিসেবে সেই অফিসার দেখালেন, একটি প্যাকিং বাক্স। তাতে অপহৃতা এক নারীকে অজ্ঞান করে রাখা হয়েছে, এক দেশীয় মহারাজার কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এই ঘটনা স্থান পায় ‘জঙ্গম’ উপন্যাসে।

(৩)

মেডিক্যাল কলেজে ছাত্রজীবন পর্বে নাগরিক-অভিজ্ঞতার ভাণ্ডটি যেন এমনই নানা অভিজ্ঞতায় পূর্ণ হতে থাকল।

আর পড়াশোনা কেমন চলে? এ বিষয়ে পরিমল গোস্বামীর বর্ণনার উপরে নির্ভর করতে হয়। বোর্ডিংয়ে তখন একই ঘরে থাকেন বনফুল, তাঁর দূর সম্পর্কীয় ভাই সিদ্ধেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় আর পরিমল গোস্বামী। মেসের পরিবেশটি খাসা।

ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সজনীকান্ত দাস-সহ অন্যরা এবং বনফুল।

তিনটি তক্তপোশ। তার তলায় কয়েকটি হাঁড়ি। তাতে ফর্মালিনে চোবানো ‘মানুষের মগজ, ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড প্রভৃতি’। মেডিক্যাল কলেজ থেকে আনা। এ সবের আয়োজন মেডিক্যাল স্কুলের ছাত্র সিদ্ধেশ্বরকে পাঠ দেওয়ার জন্য। হয়তো বা নিজের পড়াশোনাটাও ঝালিয়ে নেওয়া চলত এ ভাবে।

ওই মেসে উঁকি দিলে দেখা যায়, এক দিকে শতরঞ্চিতে বসে মানুষের ফুসফুস কাটা চলছে। অন্য দিকে প্রেশার কুকারে রান্না হচ্ছে মাংস!

ডাক্তারি-পাঠ পর্বেই নানা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে এলেন বনফুল। তেমনই এক জনের কথা।

দিনটা রবিবার। বনফুল গিয়েছেন এক জনের বাড়ি। বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই প্রশ্ন, দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ কবে হয়েছিল? নিরুত্তর বনফুল। তা দেখে সেই গৃহকর্তা বললেন, ‘বিজ্ঞানের ছাত্র বলে দেশের ইতিহাস জানবে না!’ শেষমেশ ওই বাড়ির গ্রন্থাগারে বসেই ঈশানচন্দ্র ঘোষের লেখা ইতিহাসের বই পড়া শেষ করে তবে মিলল মুক্তি।

যাঁর সঙ্গে বনফুলের এই অভিজ্ঞতা, তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায়।

এই সময়পর্বেই আলাপ শিশির ভাদুড়ীর সঙ্গেও। তিনি বনফুলকে আরব্য উপন্যাস বা কোনও সামাজিক বিষয়ে নাটক লেখার পরামর্শ দেন। পরবর্তী সময়ে বনফুলের ‘শ্রীমধুসূদন’ প্রকাশের পরে শিশিরবাবু স্বয়ং ভোরের ট্রেনে ভাগলপুর এসে জানান, ‘আপনার শ্রীমধুসূদন অভিনয় করব।’ যদিও তা হয়ে ওঠেনি।

ডাক্তারি পড়ার একেবারে শেষ বছরে বনফুলকে চলে যেতে হয় পটনায়। সেখানে মেডিক্যাল কলেজ তৈরি হওয়ায় এই চলে যাওয়া। কিন্তু ম্যাটার্নিটি ওয়ার্ডে প্রশিক্ষণ ঠিক মতো হয়নি বলে তিনি গেলেন বেঙ্গালুরুতে। সেখানে বিস্তৃত অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হল।

এখানেই আলাপ এক স্কটিশ নার্সের সঙ্গে। কবি ও স্বদেশি জামাকাপড় পরিহিত ‘স্টুডেন্ট মুখার্জি’–কে বেশ পছন্দই করেন নার্স। আলাপ গড়াতেই আবদার, একটি ইংরেজি কবিতা লিখে দিতে হবে। বেঙ্গালুরু থেকে আসার আগে বনফুল লিখেও দিলেন কবিতাটি। পরে যা ‘ডানা’ উপন্যাসে ব্যবহার করবেন বনফুল। পটনার প্রিন্স অফ ওয়েলস মেডিক্যাল কলেজে বনফুল ফেরার পরে সেই নার্স একটি চিঠি দিলেন বনফুলকে।

তার পরে আর আলাপ অবশ্য গড়াল না। ডাক্তারির ফাইনাল পরীক্ষার আগেই বিয়ে। ইতিমধ্যে রমরমিয়ে ‘প্রবাসী, ‘ভারতী’, কল্লোল’ পত্রিকায় লেখাও ছাপা হচ্ছে। পাত্রী লীলাবতী বন্দ্যোপাধ্যায়। নিবেদিতার প্রতিষ্ঠিত স্কুলে স্বয়ং মা সারদার তত্ত্বাবধানে বড় হয়েছেন লীলাবতী। বিয়ের পরে পড়াশোনা শেষ করার জন্য লীলাবতীদেবী বেথুন হস্টেলে থাকেন। আর নববধূকে উদ্দেশ্য করে নানা চিঠি, কবিতা লিখলেন বনফুল। চিঠির কয়েকটি নিয়ে ‘কষ্টিপাথর’  উপন্যাস প্রকাশিত হয়।

(৪)

ডাক্তারি পাশের পরে কর্মজীবনে ফের দেখা গেল স্বাধীনচেতা বনফুলকে।

পটনা মেডিক্যাল কলেজে হাউস সার্জেনের কাজ পেলেন। কিন্তু কাজে যোগ দেওয়ার দিনেই বনফুল দেখলেন, হাসপাতালের নিয়মের প্রথমটিতেই লেখা ‘সালাম’ দিতে হবে সিনিয়রদের। এই নিয়ম দেখেই বনফুল ‘গুডবাই’ বলে সটান বেরিয়ে এলেন।

ঠিক করলেন প্যাথলজিতে ট্রেনিং নিয়ে স্বাধীন ভাবে পশরা জমাবেন। চারুব্রত রায়ের তত্ত্বাবধানে পাঠ নিয়ে অবশ্য যোগ দিলেন আজিমগঞ্জ মিউনিসিপ্যালিটি হাসপাতালে। সেখানে থাকাকালীনই বনফুলের প্রথম সন্তান কেয়া’র জন্ম। কিন্তু বেশি দিন থাকা হল না আজিমগঞ্জের নিশ্চিন্ত চাকরিতেও। রাজনীতির নানা কূটকচালি থেকে দূরে সরে যেতে চাকরি ছেড়ে দিলেন। এর পরে ভাগলপুরে ল্যাবরেটরি খুললেন।

সেখানেও দেখা গেল মেজাজি বনফুলকে। গল্পটা শুনিয়েছেন বনফুলের ছোট ভাই, পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়। তিনি জানিয়েছেন, জেলার ম্যাজিস্ট্রেট স্ত্রীর ইউরিন নিয়ে এসেছেন, বনফুলের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করাবেন বলে। এসেই হাকিমি মেজাজে কথাবার্তা। মুহূর্তে সেই বোতল-ভর্তি ইউরিন নর্দমায় ফেলে দিলেন বনফুল। ল্যাবরেটরি থেকে বার করে দিলেন ম্যাজিস্ট্রেটকে।

বাড়িতেও এমনই রাগী, চটা মেজাজ বনফুলের। তবে প্রায়ই জব্দ হন স্ত্রীর কাছে। প্রায়ই দেখা যায়, রেগে গেলে বনফুল হাতের কাছে থাকা জিনিসপত্র ভাঙচুর করছেন। এক বার তেমনই রাগ। ছ’খানা কাচের প্লেট ভেঙে তবে রাগ কমল। আর সঙ্গে সঙ্গে শীতল গলায় লীলাবতীর হুকুম, ‘কালকে যাবে, আবার নিয়ে আসবে।’

(৫)

স্ত্রীর সঙ্গে প্রায়ই এমন ঝগড়া হয়। ঝগড়ার অন্যতম কারণ, বনফুলের বিপুল খাদ্যপ্রেম। তাঁর খাওয়া নিয়ে নানা গল্পও প্রচলিত।

গল্পটা শুনিয়েছেন সজনীকান্ত দাসের ছেলে রঞ্জনকুমার দাস। এক গুণমুগ্ধ ভক্তের বাড়ি থেকে নিমন্ত্রণ এসেছে। ‘বলাইকাকা’র সঙ্গী হয়েছেন রঞ্জনবাবু। গন্তব্যের কাছাকাছি, এক জায়গায় একটি দোকানে বনফুল দেখলেন, ফাউল কাটলেট ভাজা হচ্ছে। তা সেই ভক্তের বাড়িতে ঢুকলেন দু’জনে। গল্প চলছে তো চলছেই। অবশেষে পরিচারক চায়ের পেয়ালা আর সঙ্গে করে দু’টি প্লেটে নোনতা বিস্কুট নিয়ে হাজির হয়েছেন।

আর তা দেখেই এ বার আগুনে ঘি পড়ল যেন। বনফুল চিৎকার করে উঠলেন, ‘তোমাদের ব্যাপার কী বলো তো! …অতিথি আপ্যায়ন দু’খানা বিস্কুট দিয়ে!’ সঙ্গে সংযোজন, ওই ফাউল কাটলেট যেন খানকতক আনা হয়। আনা হলও। আর কাটলেট দেখেই রাগ গলে জল।

বনফুলের খাদ্যরসের প্রতি আগ্রহের কথা জানিয়েছেন তাঁর ছোট ভাই পরিচালক অরবিন্দবাবু ও ভ্রাতুষ্পুত্র অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়। অরবিন্দবাবু জানান, রাতে মাংস, দিনে দু’রকম মাছ না হলে দাদার চলত না। প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরির মেথর সীতাবীর মেয়ের বিয়েতে মেথরপল্লিতে গিয়ে মোটা পুরি, ছোলার ডাল, শুয়োরের মাংস, টক দই আর বোঁদে খাওয়ারও অপূর্ব বর্ণনা দিয়েছেন অরবিন্দবাবু। আর অভিজিৎবাবু জানিয়েছেন, বনফুলের উপন্যাস নিয়ে তৈরি মৃণাল সেন পরিচালিত ‘ভুবন সোম’-এর শুটিং চলাকালীন উৎপল দত্তের টিফিন বাক্সে করে বনফুলের প্রিয় কষা মাংস নিয়ে আসার কথা। এমনকি এও দেখা যাবে, বনফুলের কাছে ‘হাটে বাজারে’-র অশোককুমারও সাতসকালে নিজের রান্না করা মাংস নিয়ে হাজির হচ্ছেন।

এই দু’টি ছাড়া বনফুলের অন্য আর যে বইগুলি অবলম্বনে সিনেমা হয়েছিল, তার অন্যতম ‘অগ্নীশ্বর’। পরিচালক ছোট ভাই অরবিন্দবাবু। অরবিন্দবাবুর ছেলে অভিজিৎবাবু এই সিনেমা সংক্রান্ত একটি ঘটনার কথা জানান।

‘অগ্নীশ্বর’ সিনেমার একটি ‘শো’ হচ্ছে নিউ থিয়েটার্স স্টুডিয়োয়। পরিচালক, উত্তমকুমার, সকলেই রয়েছেন। মহানায়ক একটু ভয়েই আছেন, কে জানে কাহিনিকার কী বলবেন এই ভেবে। ‘শো’ শেষ। কিন্তু বনফুলের প্রতিক্রিয়া মিলছে না। উত্তমকুমারও উসখুস করছেন। তা দেখে ভাই তথা পরিচালক বললেন, ‘উত্তম কেমন করেছে, বলবে তো!’

এ বার আর প্রতিক্রিয়া জানাতে সময় নিলেন না বনফুল। মুখে চওড়া হাসি এনে মহানায়কের কাঁধে হাত রেখে বনফুল বললেন, ‘অপূর্ব! অগ্নীশ্বরের ব্যক্তিত্বকে তুমি সুন্দর ফুটিয়েছ।’

(৬)

খাওয়াদাওয়া এবং খাওয়ানো, দু’টিতেই বনফুলের জুড়ি মেলা ভার। তবে এমন খাদ্যপ্রেমে উৎসাহ বনফুল রবীন্দ্রনাথের থেকে পেয়েছিলেন কি না, তা অবশ্য জানা যায় না। তবে রবীন্দ্রনাথের জলখাবারের সাক্ষী তিনি।

১৯৩৯-এর নভেম্বর। বেশ ঠান্ডা শান্তিনিকেতনে। ভোররাতে শান্তিনিকেতন এসেছেন বনফুল। তখনই ‘শ্যামলী’ বাড়ি থেকে হড়াস হড়াস করে জল ঢালার শব্দ শোনা গেল। কী ব্যাপার? পরিচারক নীলমণির কাছে জানতে চাইলেন বনফুল। নীলমণির উত্তর, ‘বাবামশাই চান করছেন।’ স্নান থেকে বেরিয়ে জলখাবারের আয়োজন রবীন্দ্রনাথের জন্য।

তালিকাটি ভালই। মুগের ডাল, ছোলা, বাদাম, পেস্তা ভেজানো। গোলমরিচ গুঁড়ো দিয়ে ডিম সিদ্ধ। সঙ্গত দেয় অস্ট্রেলিয়া থেকে আনানো মধু দিয়ে মাখানো পাঁউরুটি, ফল। সব শেষে এক খাবলা মুড়ি আর চিনি দেওয়া কফি!

কে জানে বিপুল খাদ্যরসিক বনফুলও হাঁ হয়ে গিয়েছিলেন কি না এই তালিকা দেখে।

তবে খাদ্যপ্রেমের কারণে বিড়ম্বনার মুখেও পড়তে হয়েছে হাই ব্লাড সুগারের রোগী বনফুলকে। বনফুলের বড় ছেলে অসীম আর রঞ্জনবাবু গিয়েছেন সাহিত্যিকের ভাগলপুরের বাড়ি। বাড়ি পৌঁছতে সামান্য দেরি হয়েছে দু’জনের।

কিন্তু বাড়িতে পা দিতেই অবাক দু’জনে। দরজা থেকেই শুনলেন স্বামী-স্ত্রী’র তুমুল ঝগড়া। আসলে এর কারণ, ছেলেরা আসবে বলে লীলাবতী দু’টি আস্ত ইলিশের রোস্ট, মাংসের কোর্মা, ক্ষীর তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ছেলেদের পৌঁছতে দেরি হচ্ছে দেখে ততক্ষণে একটি গোটা ইলিশ, কোর্মার অর্ধেকটা ও ক্ষীর বেশ খানিকটা খেয়ে ফেলেছেন বনফুল। স্ত্রী’র নির্দেশে ফের থলি হাতে বার হতে হল বনফুলকে।

স্ত্রী ‘লী’-র সংসারে এ ভাবেই ‘সম্মানিত অতিথি’র দাম্পত্য-জীবন কাটিয়েছেন বনফুল। সেই সংসার-জীবন সাজানো একাধিক ভাড়াবাড়ি, ভাগলপুরের আমোদপুর মহল্লায় কেনা বাড়ি ‘গোলকুঠি’র চৌহদ্দিতে। এই সুখী দম্পতির চার সন্তান— কেয়া, অসীম, চিরন্তন ও করবী।

শেষমেশ অবশ্য ভাগলপুরের পাট চুকিয়ে বনফুলের সংসার উঠে এল কলকাতায়, লেকটাউনে।

এই চলে আসার দিনটার কথা জানা যায় পটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান সত্যেন্দ্রনাথ ঘোষালের অভিজ্ঞতা থেকে। ১৯৬৮-র ১৬ জুন। ভাগলপুর স্টেশনে উপচে পড়ছে ভিড়। স্টেশন মাস্টার নিজে প্রথম শ্রেণির প্রতীক্ষালয় থেকে চেয়ার আনিয়েছেন, বনফুল অপেক্ষা করবেন বলে। ভিড়ের মধ্য থেকে এক জন বলে উঠলেন, ‘বাড়িটা বিক্রি না করলেই পারতেন। ভাগলপুরের সঙ্গে সম্পর্ক তা হলে বজায় থাকত।’ মুহূর্তে পাশে থাকা এক মারোয়াড়ি ভদ্রলোক বললেন, ‘এখন সে বাড়ি রইল না, ভাগলপুরে সব বাড়িই ওঁর বাড়ি হয়ে গেল। যখন খুশি আসবেন, যেখানে খুশি উঠবেন।’

(৭)

পারিবারিক জীবনে মিতব্যয়ী নন বনফুল। তবে সময়-সুযোগ বুঝে ছেলেমেয়েদের গল্প শোনানোয় কোনও কসুর ছিল না বাংলা ছোটগল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পীর। ছোট ছেলে চিরন্তনের স্মৃতিতে রয়েছে বাবার একটি মজার স্বভাবের কথা। বনফুল বাড়িতে পর্দা টাঙানো একেবারেই পছন্দ করতেন না। তার কারণ হিসেবে বনফুলের যুক্তি, ‘আমরা তো জামাকাপড় পরেই বসে রয়েছি!’

কিন্তু আপাত-উদাসীন এই মানুষটিকেই আবার দেখা যায় ছোট মেয়ে করবীর জন্য পাত্র খুঁজতেও। করবীদেবীর বিয়ে হয় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট কাজলকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

কিন্তু ডাক্তারি জীবন হোক বা পারিবারিক জীবন, সেগুলি সবই বনফুলের সাহিত্যিক সত্তার এক-একটি অঙ্গ বোধহয়। আর তাই মেয়ের জন্য পাত্র খোঁজার বিষয়টি  নিয়ে লিখেছিলেন ‘কন্যাসু’। একটা সময় বাড়ি কিনতে গিয়ে ঋণ শোধ করার জন্য ভোররাতে উঠে লেখালেখি করতে হয়েছে বনফুলকে।

তবে কোনও দিনই ফরমায়েশি লেখায় কলম সরেনি বনফুলের। এক বার পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এক খ্যাতনামা চিকিৎসক তথা ভারতের বিশিষ্ট এক রাজনীতিবিদ দেশের কোনও জরুরি সমস্যা বা দেশের মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা তৈরি করা যাবে, এমন কোনও বিষয় নিয়ে নাটক লিখতে বললেন বনফুলকে। যদিও তা তিনি লিখতে পারেননি। অনুরোধটা করেছিলেন বিধানচন্দ্র রায়।

তবে রাজনীতির প্রসঙ্গ যখন উঠল তখন এ কথা বলা চলে, বনফুল প্রত্যক্ষ ভাবে রাজনীতির সঙ্গে কোনও দিন জড়াননি। যদিও রাজনীতি তাঁর সৃষ্টিকে প্রভাবিত করেছে। বিশ্বযুদ্ধ, সুভাষচন্দ্র বসুর কংগ্রেসের সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার মতো নানা ঘটনা সামাজিক ক্ষেত্রকে এক সময় নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই সময়ের প্রভাব রয়েছে ‘অঙ্গারপর্ণী’ কবিতা সংগ্রহে। আবার অগস্ট আন্দোলনের ছায়া দেখা যায় কবিতা সঙ্কলন ‘আহবনীয়’-তে। পরে ‘অগ্নি’ উপন্যাসেও রাজনীতির প্রভাব দেখা যায়।

বনফুলের সাহিত্যে রাজনীতি দেখে রবীন্দ্রনাথ জিজ্ঞাসা করলেন বনফুলের ‘পলিটিক্‌স‌্’-এর দিকে ঝোঁক আছে কি না। ‘নেই’ শুনে কবির স্বগতোক্তি, ‘সাহিত্যিক পলিটিকস করলে পলিটিকসও হয় না, সাহিত্যও মার খায়। আমি পলিটিকস করতে গিয়ে ঘা খেয়েছি।’ রবীন্দ্রনাথ এ ভাবেই বনফুলের কাছে নিজের নানা কথা জানিয়েছেন, নিজস্ব ভঙ্গিতে। এই রবীন্দ্রনাথই আবার চিঠিতে ‘নির্মোক’ উপন্যাসের প্লট দেন বনফুলকে। যদিও এর মধ্যে আজিমগঞ্জের হাসপাতালে কিছু দিন থাকার অভিজ্ঞতারও মিশেল দিয়েছেন বনফুল।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বনফুলের জাগতিক সম্পর্কের শেষ, ২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দে। রেডিয়োয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে শোনা গেল ‘সমস্ত দেশের বুক ফাটা হাহাকার’, মহাকবির প্রয়াণ-সংবাদ। এই প্রয়াণ নাড়িয়ে দিল বনফুলকেও। কবির উদ্দেশে কবিতায় প্রশ্ন রাখলেন স্নেহধন্য বনফুল, ‘আবন্ধনলোকে তুমি লভিবে নির্বাণ?’

কিন্তু এই জিজ্ঞাসা শুধু কি রবীন্দ্রনাথকেই? না কি বনফুলের নিজেকেও।

৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯ প্রয়াণ বনফুলের। তার আগে লেখা শেষ উপন্যাস ‘হরিশচন্দ্র’-তে হয়তো তাই আপন ‘মর্জিমহল’-এর বাসিন্দা বনফুল বাঙালিকে বলে গিয়েছেন, ‘আমি আর ফিরব না। তোমরা যন্ত্র সভ্যতার বিলাসে সুখে থাক।’

ছবি: পরিমল গোস্বামী, অলোক মিত্র

ঋণ: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়, ‘প্রবাসী’, ‘পশ্চাৎপট’, ‘রবীন্দ্রস্মৃতি’, ‘মর্জিমহল’: বনফুল, ‘বনফুল’: প্রশান্তকুমার দাশগুপ্ত, ‘স্মৃতিচিত্রণ’: পরিমল গোস্বামী, ‘দেশ’,

‘কোরক সাহিত্য পত্রিকা’। 

লেখকঃ অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়

সৌজন্যেঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৩ অক্টোবর ২০১৮